অবশ্যই ট্রেন সাগর মহাসাগরের উপর দিয়ে উড়ে যেতে পারে না তবে তার মানে এই নয় যে ট্রেনও প্লেনের সাথে পাল্লা দিয়ে দ্রুত চলতে পারে না। সৌভাগ্যক্রমে, আধুনিক প্রযুক্তির কিছু ট্রেন প্লেনের মত দ্রুত গতি তো বটেই, সুযোগ সুবিধার দিক থেকেও কোন অংশে পিছিয়ে নেই অন্য যে কোন যানবাহনের দিক থেকে।

আজকের আর্টিকেলটা সাজানো হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগামী আটটি ট্রেন নিয়ে



১। সাংঘাই ম্যাগলেভ (Sanghai Maglev)

প্রতি ঘন্টায় সর্বোচ্চ ৪৩১ কিলোমিটার বেগে চলা সাংঘাই ম্যাগলেভ বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত গতির ট্রেন। ট্রেনটি পরিচালনা করে সাংঘাই ম্যাগলেভ ট্রান্সপোর্টেশন ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি। সাংঘাই ম্যাগলেভ চলে দ্রুত গতির জন্য নির্মিত ম্যাগনেটিক লেভিটেশন লাইনের উপর দিয়ে।

সাংঘাই ম্যাগলেভকে বলা যায় ম্যাগনেটিক লেভিটেশন প্রযুক্তির সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবহারিক উদাহারণ হিসেবে। অন্যান্য ট্রেন লাইনের মত সাংঘাই ম্যাগলেভের কোন চাকা নেই। বরং ট্রেন এবং ম্যাগনেটিক ট্যাকের মধ্যে যে ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরী হয়, তাতেই ভেসে ছুটে বেড়ায় ট্রেনটি।

ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক পুল শক্তিশালী ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরী করে ট্রেনটি ছোটার সময়, যার ফলে ট্রেনটি ট্র্যাক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কোন সম্ভাবনাই থাকে না। আবার ট্রেনটি যেহেতু ট্র্যাক না ছুঁয়ে থাকে, তাই ট্রেন এবং ট্র্যাকের মধ্যে কোন সংযোগ এবং সংঘর্ষ ঘটে না চলার সময়।

সাংঘাই ম্যাগলেভ স্থির অবস্থা থেকে ট্রেনটির সর্বোচ্চ গতি ৪৩১ কিলোমিটার তুলতে সময় নেয় মাত্র চার মিনিট। সাংঘাই শহরের ১৮.৯৫ মাইল লম্বা ম্যাগলেভ লাইনটিই এখন পর্যন্ত পৃথিবীর একমাত্র ম্যাগলেভ লাইন যেখানে বানিজ্যিক ভাবে ট্রেনটি চলতে শুরু করেছে ২০০৪ সাল থেকে।ট্রেনটি লং ইয়ার্ড রোড থেকে পুডং ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের রুটে চলাচল করে। পুরো জার্নিটা সম্পূর্ণ করতে সাংঘাই ম্যাগলেভটি সময় নেয় মাত্র সাত মিনিট বিশ সেকেন্ড।

ট্রেনটি সর্বমোট ৫৭৪ জন যাত্রী পরিবহনে সক্ষম। ট্রেনটি প্রতি পনেরো মিনিট পর পর পরিচালিত হয়।ট্রেনটিতে যাত্রা করতে চাইলে সাধারণ যাত্রী হিসেবে আপনাকে খরচ করতে হবে আট ডলার এবং ভিআইপি যাত্রী হিসেবে ভ্রমণ করতে চাইলে ষোল ডলার।সাংঘাই ম্যাগলেভ একমাত্র বানিজ্যিক ভাবে পরিচালিত ম্যাগলেভ ট্রেন

২। হারমোনি সিআরএইচ ৩৮০এ (Harmony CRH 380A)

চায়না রেলওয়ের অধীনে পরিচালিত হারমোনি সিআরএইচ ৩৮০এ পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দ্রুতগামী ট্রেন।বানিজ্যিক পরিবহনের সময় ট্রেনটি সাধারণত প্রতি ঘন্টায় ৩৮০ কিলোমিটার বেশি গতিতে চলে না। তবে পরীক্ষামূলক চালনায় ট্রেনটি এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৩৭০ কিলোমিটার বেগে চলে রেকর্ড গড়েছে৷

চায়না রেলওয়ে কতৃপক্ষ মূলত সাংঘাই – নানজিং রুটে চলাচলের জন্য ট্রেনটি উন্মুক্ত করে ২০১০ সালের অক্টোবরে। সিআরএইচ ৩৮০এ নামের হাই-স্পিড ট্রেনটি নির্মানের পেছনে রয়েছে সিএসআর কিংদো সিফাং লোকোমোটিভ এবং রোলিং স্টক কোম্পানি।

ট্রেনটির বডিতে ব্যবহৃত হয়েছে স্বল্প ওজনের এলুমিনিয়াম এবংট্রেনটির সামনের অংশটুকু দেখতে মাছের মাথার মত। একটু অদ্ভুত হলেও ডিজাইনটি এরোডায়নামিক প্রেশার কমায় ট্রেনটি ছোটার সময়। এই ট্রেন সম্পূর্ণরূপে ঝাঁকুনি মুক্ত। ঘুমন্ত কোনো ব্যক্তিকে হারমোনি ৩৮০-তে তুলে দিলে সেই ব্যক্তিটি ঘুম ভেঙে জানালার বাইরে দেখার আগ পর্যন্ত টের পাবেন না যে, তিনি ঘণ্টায় সাড়ে তিনশো কিলোমিটার গতিতে ছুটছেন!

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গতি সম্পন্ন ট্রেনটি প্রতিবারে ৪৯৪ জন যাত্রী পরিবহন করতে সক্ষম।প্রতিজন যাত্রীই আলাদা আলাদাভাবে রিডিং ল্যাম্প, পাওয়ার পোর্ট, ইলেকট্রিক ডিসপ্লের মত সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকে।এছাড়াও ড্রাইভার কেবিনের কাছে ভিআইপি সাইটসিয়িং ইউনিট রাখা আছে, যেখানে আপনি যাত্রার স্বল্প সময়ে আশেপাশের দৃশ্য উপভোগ করতে পারবেন।সিআরএইচ ৩৮০এ ট্রেনে একটি পূর্ণ বগীই রাখা আছে যাত্রীদের খাবার এবং পানীয় পরিবেশনের উদ্দেশ্যে।

 

৩। এজিভি ইটালো (AGV Italo)

বর্তমান ইউরোপে সর্বোচ্চ গতির ট্রেন হলো এজিভি ইটালো। হাই-স্পিড ট্রেনটির সর্বোচ্চ গতি ৩৬০  কিলোমিটার  প্রতি ঘন্টায়। কিন্তু ট্রেনটি নির্মানের পর বানিজ্যিকভাবে ট্রেনটি নামানোর আগে যখন ট্রায়াল হিসেবে চালানো হয় ২০০৭ সালে, তখন এজিভি ইটালো রেকর্ড গতি ৫৭২ কিলোমিটার বেগে চালিয়ে দেখানো হয়। মাল্টিপল ইউনিটের ট্রেনটি ফ্রেন্জ কোম্পানি এলস্টম।ইটালিয়ান রেল কোম্পানি নৌভো ট্রাসপোর্তো ভিয়াজ্জাতরি(NTV) ২০০৮ সালে ২৫ টি এজিভি ইটালো ট্রেনের অর্ডার করে, এতে নৌভো ট্রাসপোর্তোকে খরচ করতে হয় ৬২৫ মিলিয়ন ডলার।

ইজিভি ইটালো জনসাধারণের জন্য সেবা দিতে শুরু করে অবশ্য ২০০৭ সাল থেকেই৷ এটি চলাচল করে রোম এবং নেপলসের যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে। ১৪০ মাইল দূরত্বের এই শহর দুটিতে এজিভি ইটালোর যাত্রীরা ভ্রমণ করতে পারে মাত্র এক ঘন্টায়৷এজিভি ইটালোর গঠন ভীষণ ভাবে ইকো-বান্ধব, ট্রেনটির যন্ত্রপাতির বেশিরভাগেরই অর্থাৎ প্রায় ৯৮ শতাংশের পুনর্ব্যবহার সম্ভব।

এজিভি ইটালোতে আছে আটটি বগী, যা মোট তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত। যদিও সব শ্রেণীতে লেদারের আরামদায়ক সিটের সাথে সাথে ফ্রি ওয়াইফাই ব্যবস্থাও রয়েছে৷। ইতালির রোম ও নেপলস শহরের মধ্যে চলাচল করা এই ট্রেন খুবই পরিবেশবান্ধব। এর প্রায় ৯৮ শতাংশই পুনরায় ব্যবহারযোগ্য। চারটি ক্লাব, চারটি প্রাইমা এবং তিনটি স্মার্ট বগিসহ মোট ১১টি বগি নিয়ে ছুটে চলে এই ট্রেন।

৪ সিমেন্স ভেলারো ই/এভিএস ১০৩ (Siemens Velaro E/AVS)

ভেলারো ই/এভিএস হলো ভেলারো ই হাই স্পিড ট্রেনের স্প্যানিশ ভার্সন, যা জার্মান ইন্জিনিয়ারিং কোম্পানি সিমেন্স দ্বারা উন্নত করা হয়েছে৷ স্পেইনে ভেলারো ই ট্রেনটি এভিএস ১০৩ নামেই পরিচিত। ট্রেনটি স্পেইনে বার্সেলোনা এবং মাদ্রিদ শহরের যোগাযোগে পরিচালিত হয়।

ভেলারো ই ট্রেনটি সর্বোচ্চ সর্বোচ্চ ৪০২ কিলোমিটার গতিবেগে চলতে পারে। বার্সেলোনা থেকে মাদ্রিদ শহরে পৌছতে ট্রেনটির যাত্রীদের আড়াই ঘন্টা সময় লাগে। আর ট্রেইলগুলোতে, ভেলারো ই প্রতি ঘন্টায় ২৫০.৮৪ মাইল পর্যন্ত গতিতে চলতে পারে।স্পেইনের ন্যাশনাল রেলওয়ে ২০০১ সালে উচ্চগতি সম্পন্ন ভেলারো ই ট্রেন নির্মানের অনুমোদন দেয় যা চালু হয় ২০০৭ সালের জুনে।আট বগী সম্পন্ন ট্রেনটিতে মোট ৪০৪ জন যত্রীর বসার ব্যবস্থা আছে।

৫ ট্যালগো ৩৫০, স্পেইন (Talgo 350, Spain)

স্টেট রান রেলওয়ে কোম্পানির অধীনে পরিচালিত ট্যালগো ৩৫০ একটি হাই স্পিড ট্রেন। ট্রেনটির সর্বোচ্চ গতি ঘন্টায় ৩৫০ কিলোমিটার । ট্যালগো ৩৫০ স্পেইনের মাদ্রিদ থেকে বার্সেলোনার রেলপথে চলাচল করে।ট্রেনটিতে দুটো পরিচালনা বগী এবং বারোটি যাত্রী বগী আছে। ট্রেনটির সামনের দিকে হাঁসের ঠোঁটের মতো বাঁকানো নাক থাকায় স্পেনে ট্যালগো ৩৫০ কে ‘পাতো’ নামেও ডাকা হয়।ট্যালগো ৩৫০ এর স্বতন্ত্র ডিজাইন নিখুঁতভাবে ঢেউখেলানো চাপ নিয়ন্ত্রণে করে।ট্রেনটিতে বসার ব্যবস্থা চার ভাগে বিভক্ত, ক্লাব ক্লাস, ফার্স্ট ক্লাস, বিস্ট্রো ক্লাস এবং কোচ ক্লাস। চার ভাগে বিভক্ত হলেও সব ভাগেই আরামদায়কভাবে বসার পাশাপাশি ফুটরেস্টের ব্যবস্থাও রয়েছে।এছাড়া প্রতিটি সিটেই আলাদা আলাদা অডিও এবং ভিডিও উপভোগ করার ডিভাইসও আছে।প্রতি বগীর ভেতরে এবং বাইরে রিয়েল টাইম ইনফরমেশন প্যানেল রয়েছে।

৬। ই-৫ শিনকানশেন হায়াবুসা, জাপান (E-5 Shinkango Hayabusha, Japan)

২০১১ সালে ফ্রান্সে দুটি দ্রুতগামী ডুপ্লেক্স ট্রেন চালু হবার বছরই জাপানে চালু হয় তাদের সবচেয়ে দ্রুতগামী ট্রেন ই-৫ শিনকানশেন হায়াবুসা। ই-৫ সিরিজের ট্রেনগুলোর মধ্যে হায়াবুসাই সবচেয়ে দ্রুতগামী ট্রেন এবং এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটার। ট্রেনের সামনের অংশে অর্থাৎ ইঞ্জিন বগিতে রয়েছে ১৫ মিটার লম্বা একটি নাক সদৃশ গঠন। তবে এটি নিছক একটি ডিজাইন নয়। এর আকার এরকম হওয়ায় কোনো টানেলের মধ্য দিয়ে ট্রেন চলাকালীন শব্দ কমে যায় অনেকাংশে! ৭৩০ জন যাত্রী বহন করা এই ট্রেন আওমরি শহরের সাথে টোকিও শহরের সংযোগ স্থাপন করে। ই-৫ সিরিজের প্রতিটি ট্রেনে রয়েছে তিন ক্যাটাগরির কম্পার্টম্যান্ট- স্ট্যান্ডার্ড, গ্রিন ও গ্রান(বিজনেস ক্লাস)। পুরো ট্রেন জুড়ে রয়েছে সাউন্ডপ্রুফ ব্যবস্থাও।

৭। এলস্টোম ইউরোডুপ্লেক্স, ফ্রান্স (Elostom Uroduplex,France)

টিজিভি ডুপ্লেক্সেরই একটি সংস্করণ হচ্ছে ইউরোডুপ্লেক্স, যা এলস্টোম কোম্পানিরই তৈরি। এর গতিও টিজিভি ডুপ্লেক্সের সমান। তবে বিশেষত্ব হচ্ছে, এটি আন্তঃইউরোপীয় রুটে চলাচল করে। ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি ও লুক্সেমবার্গ, এই চারটি দেশকে সংযুক্ত করা এই ট্রেন সার্ভিস শুরু হয় ২০১১ সালের শেষের দিকে। ১,০২০ জন যাত্রী বহনক্ষম এই ট্রেনের আরো একটি বিশেষত্ব হচ্ছে, ট্রেনটি অনেক কম শক্তি খরচে অধিক গতিতে চলতে পারে।

৮। টিজিভি ডুপ্লেক্স, ফ্রান্স (TGV Duplex France)

 

ফ্রান্সের দ্রুততম ট্রেন টিজিভি ডুপ্লেক্স ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩১৯ কিলোমিটার বেগে ছুটতে পারে। ডাবল ডেকের এই দ্রুতগামী ট্রেনগুলো সংযুক্ত করেছে ফ্রান্সের সকল প্রধান শহরগুলোকে। দেশী কোম্পানি এলস্টোম এই ট্রেন তৈরিতে ব্যবহার করেছে উচ্চমানের অ্যালুমিনিয়াম, যা এই ট্রেনের ওজন হ্রাস করে। অন্যদিকে প্রতিটি বগিই এতোটা অনমনীয় যে, সর্বোচ্চ গতিতেও যদি একটি টিজিভি ট্রেন দুর্ঘটনা কবলিত হয়, তাহলেও এর বগিগুলো একেবারে দুমড়ে মুচড়ে যাবে না। ফ্রান্সের ‘এসএনসিএফ’ কোম্পানির তত্ত্বাবধানে এই ট্রেন ২০১১ সাল থেকে বিভিন্ন রুটে চলাচল শুরু করে। স্ট্যান্ডার্ড ও টিজিভি প্রো, এই দুটি ক্যাটাগরির যথাক্রমে ৬টি ও ৪টি বগি নিয়ে যাতায়াত করে টিজিভি ডুপ্লেক্স।

জনবিস্ফোরণের এই সময়ে শহরগুলোতে মানুষের চাপ রাস্তার ট্রাফিক জ্যামের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। মূল্যবান কত সময় আমরা নষ্ট করি শুধু জ্যামে বিরক্তি নিয়ে বসে থেকে। উন্নত প্রযুক্তির এই সব ট্রেনগুলো বিপুলভাবে সাধারণ মানুষের জন্য পরিচালিত হতে শুরু করলে হয়তো ট্রাফিক জ্যামের যন্ত্রণা অনেকটাই কমানো সম্ভব।

 

 

 

Leave a Comment