বিশ্বব্যাপী একটি প্রাচীন ও জনপ্রিয় প্রথার নাম
বিয়ে। বিশ্বের প্রায় সবখানেই মানুষ এ সামাজিক প্রথা অনুসরণ করে এবং পারিবারিক
বন্ধনে আবদ্ধ হয়। তবে স্থান ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ ভেদে প্রথাটি পালনে রয়েছে
ভিন্নতা। একেক
জাতি একেক রকমের নিয়ম-নীতি অনুসরণ করে থাকে এতে। আর কিছু কিছু জাতির বিবাহ নীতিতে
এমন সব বৈচিত্র্যের দেখা মেলে, যা বিস্মিত করে অন্যদের।বিশ্বের বিভিন্ন দেশের
বিভিন্ন জাতির মধ্যে প্রচলিত বিচিত্র ও বিস্ময়কর বিয়ের প্রথা নিয়ে আয়োজন
১। হবু স্ত্রীকে চুরি
প্রাচীন
স্পার্টা নগরীতে হবু বউয়েরা মাথার চুল কেটে ছেলেদের মতন পোশাক-আশাক পরে তৈরি থাকতো। এর পরের কাজটুকু ছিল মূলত হবু বরের অগ্নি
পরীক্ষা। বিয়ের ইচ্ছে থাকলে সবার চক্ষু ফাঁকি দিয়ে এই ছেলে সেজে থাকা তার হবু
স্ত্রীকে চুরি করে নিয়ে পালাতে হতো তাকে। তবেই কেবল সে নিজেকে বিয়ের উপযুক্ত বলে
প্রমাণ করতে পারতো।
২। আস্ত কাঁচা মুরগি খেয়ে বিয়েঃ
একই দেশ কঙ্গোর বান্ডা গোত্রের মেয়েরা একটি কাঁচা আস্ত মুরগির বাচ্চা খেয়ে বিয়ের যোগ্যতা দেখায়।
সঠিক রীতি অনুযায়ী খেলে বিয়ের যোগ্য বলে গণ্য হয়। পরবর্তী এক বছর সেই কনেকে পরিবার
অতি আদর যত্নে রাখে।
৩। গাছের সঙ্গে বিয়ে
ভারতের
মাঙ্গলিক মনে করা হয় এমন সব মেয়েদের প্রথমে কোনো একটি গাছের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া
হয়। বিয়ের পর গাছটি কেটে ফেলা হয়। মনে করা হয় যেসব মেয়েরা মাঙ্গলিক হয়,
বিয়ের পর পরই তাদের স্বামীর মৃত্যুর হয়। এই অভিশাপ থেকে বাঁচতে প্রথমে তাদের
গাছের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে তা ধ্বংস করে ফেলা হয়। এবার তার দ্বিতীয়, মানে আসল
বিয়েতে আর কোনো বাধাই থাকলো না। ভারতের জনপ্রিয় নায়িকা ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চনও
মাঙ্গলিক ছিলেন, আর তার প্রথম বিয়ে গাছের সঙ্গেই হয়েছিল!
৪। তিন দিন এবং তিন রাত পর্যন্ত ঘরে আটকে রাখা
ইন্দোনেশিয়ার
এক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর রীতি অনুযায়ী বিয়ের পর নবদম্পতিকে তিন দিন এবং তিন রাত
পর্যন্ত একই ঘরে আটকে রাখা হয়। এই সময়টা নবদম্পতি কোনোভাবেই টয়লেট ব্যবহার করতে
পারবে না। এমন নির্দয় কারাদণ্ডের কারণ, এতে দম্পতির ভবিষ্যত সন্তান সুস্বাস্থ্যের
অধিকারী হবে বলে বিশ্বাস করা হয়।
৫।
মুরগির বাচ্চা মারা
চীন
ও মঙ্গোলিয়ার এক গোষ্ঠীর বিয়ের তারিখ ঠিক করতে হলে হবু বর-কনেকে মুরগির ছানা
মারতে হয়। এরপর ওই মুরগির ছানার কলিজার রং পরীক্ষা করা হয়। কলিজার রং টাটকা হলে
বিয়ের তারিখ নির্ধারণ করা হবে। নইলে, টাটকা কলিজা না পাওয়া পর্যন্ত মুরগির বাচ্চা
মেরে যেতে হবে তাদের।
৬। তিমির দাঁত
আপনি
যদি ফিজির কোনো বাসিন্দা হন, তবে বিয়ে করতে হয়তো বেশ ঝামেলা হতে পারে। কেননা,
ফিজিতে শুধু ওই ব্যক্তিই কন্যার বাবাকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে পারবে যার হাতে থাকবে
একটি তিমির দাঁত। এই দাঁত সংগ্রহ করতে আপনাকে হয় যেতে হবে ব্ল্যাক মার্কেটে, নয়তবা
সমুদ্রে। পৃথিবীর বৃহত্তম স্তন্যপায়ী তিমির দাঁত সংগ্রহ করার কাজটা বেশ জটিলই বটে।
৭।
ঝাড়ুর উপর দিয়ে লাফানো
যুক্তরাষ্ট্রে
যখন দাস প্রথা ছিল, তখন কৃষ্ণাঙ্গ বর-বধু বিয়ের দিন একটি ঝাড়ুর উপর দিয়ে লাফিয়ে
যেতে হতো। এতে বোঝানো হয়, নবদম্পতি একটি নতুন জীবনে প্রবেশ করছে। প্রাচীন এ
প্রথাটি এখনও যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণের কিছু অঞ্চলে প্রচলিত।
৮। ৩৫ মোরগ ছাড়া হয় না বিয়েঃ
আফ্রিকার কঙ্গোতে ওলেম্বা উপজাতির বিয়েতে বৌয়ের মূল্য ধরা হয় ৮টা তামার ক্রশ, ৩৫টা মোরগ এবং ৪টা
কুকুর।
৯। রুয়ান্ডার অদ্ভুত বিয়েঃ
রুয়ান্ডাতে ওয়াটুসি গোত্রের বিয়েতে বর-কনে সবার
উপস্থিতিতে মুখোমুখি দাঁড়ায়। বর-কনে উভয়ে কুলির পানি একে অন্যের গায়ে ছিটিয়ে দিলে
বিয়ে হয়ে গেল। রুয়ান্ডাতে আরেকটি সম্প্রদায়ে বর নিজ হাতে কনের মুখ চুন দিয়ে সাদা
করলে বউ হয়ে যায়।
১০। মৃত মানুষকে বিয়ে
ঐতিহ্য
ভালোবেসে
মৃত মানুষকে বিয়ে করা এবং তাকে মমি বানিয়ে রাখার ঘটনা আলোড়ন তোলে। বিষয়টি অদ্ভুত
হলেও এমন আইন রয়েছে ফ্রান্সে। আইনটি হলো রাষ্ট্রপতির অনুমতি সাপেক্ষে মৃত মানুষকে
আয়োজন করে বিয়ে করা যাবে। তবে রাষ্ট্রপতি থেকে অনুমতি নিতে প্রয়োজন পড়বে কিছু
প্রমাণাদির। মৃত মানুষটি জীবদ্দশায় ওই পুরুষ বা নারীকে ভালোবাসত কি না বা তাদের
বিয়ে হওয়ার কথা ছিল কি না, এসব তথ্যাদি পেশ করতে হয় রাষ্ট্রপতির সমীপে। তারপর যদি
রাষ্ট্রপতি মনে করেন এই বিয়ে হওয়া উচিত তাহলেই বিয়ে করা যাবে মৃত ব্যক্তিকে। এদিকে
মৃত ব্যক্তির ‘ভূত বিয়ের’ প্রথা প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত ছিল। আরও অনেক জায়গাতেই
অবিবাহিত মৃত ব্যক্তিদের বিয়ে দেওয়া হয়। ভূত বিয়ের ঐতিহ্য প্রায় ২৫০০ বছরের
পুরাতন। চীনের প্রথম রাজবংশের সময় থেকে এই অদ্ভুত বিয়ের রীতি শুরু হয়েছিল বলে জানা
যায়। চীনের ভূত বিয়ের রীতি বিস্তৃতি লাভ করে হান রাজবংশের সময় বলে মনে করা হয়।
কিন্তু এই ভূত বিয়ের রীতি প্রচলিত হওয়ার পেছনে রয়েছে অদ্ভুত সব রীতিনীতি। যা
প্রচলিত হয়েছে বিভিন্ন মিথ থেকে। কোনোটা ধর্মীয় বিশ্বাস আবার কোনোটা সামাজিক
বিশ্বাস। এসব আচার অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য থাকে স্বীয় গোষ্ঠীর জীবিত কিংবা মৃত
মানুষের মঙ্গল কামনায়। ঘটনা যেভাবেই ঘটুক পৃথিবীতে মৃত মানুষের সঙ্গে এই ভূত বিয়ের
রীতি প্রচলিত রয়েছে। সুতরাং মানুষ ভালোবেসে কারও মৃত্যুর পর ভূত বিয়ে করলে অবাক
হওয়ার কিছুই নেই। ভালোবাসার প্রতি এমন
দৃষ্টান্ত সবাই পজিটিভ হিসেবেই দেখে।

Leave a Comment